Home Blog • পদ্মাপাড়ে

পদ্মাপাড়ে

পদ্মাপাড়ে

বাংলা বই, বাংলা সাহিত্য

 

—রাজশাহী কলেজের বুক পেড়িয়ে পদ্মাপাড়ে পা রাখলাম। এই সেই পদ্মা। পৃথিবী পৃষ্ঠের উঁচু নিচুর এক বিরাট মহিমা উঁচু হিমালয়ের বিশাল হৃদয়ের একটা উদার প্রকাশ ঝরণার জল গঙ্গ্রোত্রী হিমবাহ হয়ে নেমে এসেছে বঙ্গ ভূমিতে। যদিও এ নদী আজ ভারতের প্রশাসনিক সীমানায় গঙ্গা বাংলাদেশের সীমানায় পদ্মা নামে পরিচিত। তবু এটা বাঙালীর নদী। হাজার বছরের বাঙালীর সুখ দুঃখ হাসি কান্না মিশে আছে এর বুক জুড়ে। বাঙালীর বেদনা বা আনন্দাশ্রু মিলিয়ে এক বিশাল জলধারা বয়ে চলেছে বঙ্গোপসাগর অভিমুখে। আর বাঙ্গালীর দুঃখ কষ্টের দীর্ঘশ্বাস মাঝেমধ্যে চর হয়ে জেগে ওঠে পদ্মার বুকে। আবার চোখের জলের তীক্ষè ধারায় সে চর ক্ষয় হতে হতে একসময় বিলীন হয়ে যায় একাভিমুখী বিশাল জলরাশিতে। এ পদ্মার বুকে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন তার বাংলা সাহিত্যে জীবন দশর্নের এক উজ্জল প্রতিমূর্তি। পদ্মার পাড়েই জেলে পাড়ায় বসে মানিক বন্দোপাধ্যায় লিখেছিলেন তার কালজয়ী উপন্যাস। আরো অনেকে লিখেছেন অনেকে লিখবেন কেননা পদ্মা বা নদীর বুক ছাড়া বাঙালী জাতির প্রতিচ্ছবি পড়ে না আর সাহিত্যে তো জাতির জীবনেরই দর্শন।

আমরা দুজন। আমার বন্ধু মাসুম আর আমি। আমরা যখন পদ্মাপাড়ে পৌছালাম তখন বিকাল পাঁচটা। আমাদের দুজনের পদ্মাপাড়ে যাবার উদ্দেশ্যটা অবশ্য একেবারে এক নয়। আমার বন্ধু গিয়েছে তার ফোন পার্টনারের সাথে দেখা করতে আর আমি তার সঙ্গী এবং উদ্দেশ্য রাজশাহীর বুকে পদ্মার রুপটা অবলোকন করা। অবশ্য মাসুম আমাকে নিত না বা আমিও তার সাথে যেতাম না যদি সে মেয়েটি তার পূর্বপরিচিত  হত। কারণ, দুজনে বন্ধুত্ব হয় তিনজনে নয়। পদ্মার পাড়ে গিয়ে আমার চোখ গেল বিশাল পদ্মার বুকে। সম্মুখে বিশাল জলরাশি ওপাড়ে দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত চর। আর আমার বন্ধুর দৃষ্টি মুঠোফোনের স্কিনে।

-কি ব্যাপার বন্ধু, ঠিক পাঁচটায় মিসকল দেবার কথা কিন্তু দিচ্ছে না তো।

আমি আনমনে বললাম,

-তুমি ফোন দাও।

-দিচ্ছি কিন্তু রিসিভ তো করছে না।

-মাসুম, বসবে এখানে না হাটবে?

-এখানে যে আসার কথা।

-তাহলে চল বসি।

একটি চটপটির দোকানের আওতাধীন দুটি চেয়ারে দুজন বসলাম। কিন্তু বসার পর আমাদের আশপাশে তাকিয়ে মনে হল দাঁড়িয়ে থাকাই ভাল ছিল। শুধু ভাল নয় ওটাই উচিত এবং কর্তব্য ছিল। কেননা আমাদের পাশ্ববর্তী কোন জোড়া চেয়ার এমন কাউকে তাদের উপর আশ্রয় দেয়নি যার গালফ্রে- নাই। আমরা বসে শুধু সেখানকার পরিবেশটাকেই খাপছাড়া করে তুলিনি জড় পদার্থ চেয়ার দুটির সম্মানটাকেও পদ্মার জলে ভাসিয়ে দিয়েছি। কেউ কেউ বিশ্বাস করে জড় পদার্থের প্রাণ আছে। কথাটাকে বিজ্ঞানীরা এক বাক্যে অস্বীকার করলেও আমরা কিন্তু পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারলাম না। আমার মনে হল চেয়ারটি যেন নিচ থেকে বলছে , ও ভাই গর্দভ, কা-জ্ঞান থাকে তো ভালয় ভালয় উঠে পড়ো। যদি মুরোদ থাকে তো গালফ্রে- নিয়ে এসে বসো। পদ্মার জলে আকাশের প্রতিচ্ছবি দেখার উদাস মন নিয়ে এসে আমর উপর চড়াও হয়ো না। তোমার মত কবি গর্দভদের জন্য আমার জাত মান সব গেল। পারো তবে প্রেমিকা নিয়ে এসে মনের সুখে গল্প করো, জীবনকে রঙিন সপ্নে সাজাও। পদ্মার রুপকে অবহেলা করে প্রেমিকার রুপে মোহিত হও। পূজো দেও তার ছলছল চোখের চাহনিকে, পদ্মার এ ঘোলা জলকে নয়। আসন্ন মিলনের স্বপ্নে অধীর আগ্রহে কাতর হও। আমি আমার সঙ্গীকে নিয়ে নিচ থেকে চোখ টেপাটেপি করে বলি, এ মিলন বেশি দিনের নয়। শীঘ্রই বিরহ আসবে। আর তোমরা কিনা  এসেছো দুই বন্ধু মিলে আমাদের জাত ডোবাতে। ছি! আজকের এ সময়টাই মাটি হয়ে গেল।

অন্তকরণে চেয়ারের এ ভর্ৎসনা শুনে তার উপর গর্দভের মতো বসে থাকা আমার সত্যই অসহ্য হয়ে উঠল। বন্ধুকে বললাম,

-মাসুম এখানে আর কতক্ষণ বসে থাকবে? চল উঠি।

তার যদি কিছুমাত্র ব্যাক্তিত্ববোধ থেকে থাকে তবে সেও হযতবা চেয়ারের ভর্ৎসনা শুনে থাকবে। নয়তো পার্শ¦বর্তী কোন যুগল চেয়ারে উপবিষ্ট মানব যুগলের সুখালাপ তার কানে বিষবৎ মনে হচ্ছিল। তাই খুব সহজেই বলল,

-চল।

আমরা উঠে দাঁড়াতে চেয়ার জোড়া হাফ ছেঁড়ে বাঁচলেও চেয়ারের মালিক কিন্তু তা করল না। মিষ্টি সুরে প্রশ্ন করল,

-মামা কিছু খাবেন?

ব্যাপারটা আমাকে আরেক পর্ব ধাক্কা দিল। এখানকার চেয়ারে বসে কিছু পানাহার না করে উঠে যাওয়া যে বোকার স্বর্গে আরোহণের সর্ব্বোচ্চ ধাপ তা বুঝে নিজেকে সে স্থানের তীর্থযাত্রী বলেই মনে হল। বললাম,

-মামা, দুটো দেন। মাসুম বসো।

আমরা পুনরায় বসলাম। আমাদের মিটার তিনেক পূর্ব পার্শ্বের চেয়ার জোড়াতে যে দুজন যুবক যুবতি বসে ছিল তারা বেশ একটু হেসে উঠল। মনে হল, এ আমাদের বোকামীর সনদ পত্র ব্যাতিত আর কিছুই নয়। চেয়ার জোড়া এবার নিচ থেকে বলতে লাগল,

-হয়েছে? হয়েছে তো এবার!

দুজন চটপট করে চটপটিটা গিলে নিলাম। তারপর দোকানদারের হাতে টাকাটা গুজে দিয়ে হাটতে লাগলাম। আামর মনে হল, চেয়ার জোড়া পেছন থেকে বলছে,

-যাও। কা-জ্ঞান থাকে তো আর এদিকে এসো না।

মাসুমকে বললাম,

-মাসুম দেখো, নদীর পানি এ শ্রাবণেও কেমন ঘোলা দেখাচ্ছে।

মাসুম তার মুঠোফানের স্কীনে চোখ রেখে বলল,

-হু।

সে বার বার তার আকাঙ্খিত মানবীকে মুঠোফোনে ডাকতে ছিল। নেটওয়ার্ক তার সাধ্যমত চেষ্টা করেও যখন অপরপ্রান্তে সাড়া জাগাতে ব্যার্থ হয় তখন মুখটি বেজার করে বলে, নো রেসপন্স। আমিও মাসুমকে ঘোলাজল সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যখন তার নিকট থেকে হাঁ বা না বোঁধক একটা ধ্বনি শুনি ‘হু’ তখন মনে মনে বলি, নো রেসপন্স। এ দুটি নো রেসপন্সকে এক তুলাদ-ে ওজন করে সমন্বয়ের সূত্রে স্থাপন করতে পারলে মনে করা যাবে একবিংশ শতাব্দীর এক দশক পেড়িয়ে যথার্থই আমরা পদ্মাপাড়ে আছি।  মাসুম তার ফোন পার্টনারটিকে কোনদিন চাক্ষুস দেখে নাই। কথা বার্তার মোহরায় অবশ্য পদ্মার চরের কোমল ঘাসকে ডিঙ্গিয়ে অনেকপূর্বেই হয়তবা বাসর ঘরের নরম সয্যায় রাত কাটানো হয়ে গিয়েছে। এর মর্মাথটা মুঠোফোন ব্যাবহারকারী কিশোর যুবা মাত্রেই বুঝতে পারবে অধিক বলার আবশ্যক নাই। আজ পদ্মাপাড়ে দাঁড়িয়ে মাসুম বারবার তার পার্টনারকে ফোনে ধরতে চাইছে কিন্তু সে যেন পদ্মার বুকে আপন প্রতিচ্ছবির মত ভেসে বেড়াচ্ছে। ধরতে গেলে ধরতে আসে, মারতে মারতে গেলে মারতে আসে ছুইতে গেলে ছুইতে আসে। তবে ধরা দেয় না। মাসুম গত তিনমাসে ও নম্বরটির পেছনে অনন্ত পাঁচ হাজার টাকা ব্যায় করেছে। প্রতিদিন নিজের মোবাইলে ফ্লেক্সিলোড তো আছেই আবার প্রায়ই অপর প্রান্ত থেকে মিষ্টি সুরে ভেসে আসে,

-এই জানো, আমার না আজ ভীষণ মন চাচ্ছে বড় আপুর সাথে কথা বলি কিন্তু….আবার দোকানে যেতে হবে। আমার তোমার কথা ভেবেই তো দোকানে যেতে ইচ্ছে হয় না। কি সব লোকেরা বসে থাকে।

-আচ্ছা, আমি দেখছি।

মাসুম ম্যাচের সম্মুখস্থ ফ্লেক্সিলোডের দোকানে গিয়ে নম্বরটি লিখে মানিব্যাগ থেকে একটি শ’টাকার নোট বের করে দিয়ে বলে,

-ভাই একটু তাড়াতাড়ি।

একটু পর অপর প্রান্ত থেকে মিসকল আসলে মাসুম সঙ্গে সঙ্গে কল বেক করে। কিছুক্ষণ মিষ্টি সুরে ভর্ৎসনা শোনে তারপর আসে একটি থ্যাংক’স। মাসুম ভাবে তার বুঝি স্বর্গ প্রাপ্তি হয়ে গেল।

কিন্তু তার সে প্রাপ্তির দ্বারটি আজ যেন পদ্মাপড়ের পাথরের মত পাথর দিয়ে বাঁধাই করা হয়ে গিয়েছে। সে বাঁধাই বেয়ে পদ্মায় নামতে গেলে উল্টে পড়ে ডুবে মরার সম্ভাবনা আছে তা হল কলেজের ছাত্রী হোস্টেল দুইশো বিশ নম্বর রুম। সে হোস্টেল  হলো হিমালয় তার বক্ষ অনেক উদার অনেক বড় যার অভ্যান্তরে অনেক সাগর নদী বাস করে। একসময় বয়ে চলে প্রেমের রাজ্যে দিয়ে নিজের ছলনাময়ী রুপকে পদ্মার জলের মত ঘোলা করে ঘোর লাগিয়ে দিয়ে মাসুমের মত পদ্মাপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেমিক পুরুষের চোখকে। আর পদ্মারপাড়ে আজ বিকালে তো মাসুমের মত অনেকেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে সে বেচারী পদ্মাই বা কি করবে? কাকে তার প্রেমের উপযুক্ত পাত্র বলে মনে করবে। আমাকে, মাসুমকে না অন্য কাউকে? তাই সে সকলকে হাতছানি দিয়ে ডাকে, আসো আমার পাশে বসো। দেখো আমার রুপকে আমাকে নয়ন ভরে উপভোগ করো তবে সাবধান আমার বুকে ঝঁপিয়ে পড়ে আমাকে পেতে চেয়ো না তবে কিন্তু আমি সর্বগ্রাসী, কীর্তিনাশা। তোমাকে চুবিয়ে মারবো নয়তো আমার উদর বাসী কুমিরের পেটে স্থান দেব। তাই মাসুমের মত প্রেমিক যখন আবেগের অতিশায্যে প্রেমের টানে ধাপে ধাপে এগিয়ে গিয়ে পদ্মার পানির সমান্তরালে দাঁড়ায় পদ্মা তখন মুখ ফিরিয়ে বলে, নো রেসপন্স।

আমি মাসুমকে বলতাম,

-আচ্ছা, মাসুম তুমি মেয়েটাকে না দেখে কেন শুধু শুধু ওর পেছনে এত টাকা খরচ করো?

-শুধু শুধু নয় বন্ধু। ও মজা যদি বুঝতে তাহলে আর এ প্রশ্ন করতে না।

আমি মনে মনে বলতাম সে মজাই যদি তুমি পেতে মাসুম তবে আর অযথা অযথা ফোনে কথা বলতে না।

কিছুক্ষণ পূর্বদিকে হাটলাম। আমার ইচ্ছা, আরো এগিয়ে যাই। পদ্মাকে আরো একটু উপভোগ করি। বিকালে পদ্মাতীরে ছোট ছেলেদের ফুটবল, গোল্লাছুট খেলার সমারহ পড়েছে। দেখলে মনে হয়, এদের মত যদি হতাম। নদীর মুক্ত বাতাশে পড়ন্ত বিকেলে ফুটবল নিয়ে দৌড়াতাম তবে আর আজকের বাংলাদেশে চাকরির মত ফিফা টফি জয়ের দুরন্ত সাধ মনে জাগত না। কিন্তু না জাগিয়ে উপায় কি। এভাবে পদ্মাপাড়ে ফুটবল তো আর সারাক্ষণ খেলে বেড়ানো যায় না। কিছুক্ষণ পরে রাত নামবে তখন তো আর এ উদ্দম ছেলেগুলোকে পদ্মাতীর ডেকেও পাবে না। তখন না ডাকলেও আসবে পদ্মার জেলেরা যাদের পেটের দায় আছে। তাদের ক্ষিপ্ত বিক্ষিপ্ত পদচারণায় দু-একটা ছাড়া ছাড়া ডাকে পদ্মাতীর জেগে থাকবে।

মাসুম বিরক্ত হয়ে ফোনটি পকেটে রেখে বলল,

-বন্ধু, চলো ঘুরি।

-আরেকটু এগোই চলো।

-না। সন্ধ্যা হয়ে গেল।

আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাসুমের সঙ্গে প্রত্যাগমনে পা রাখলাম। হটাৎ মাসুম বেশ একটু আবেগের স্বরে বলল,

-জানো বন্ধু, মেয়েটার কণ্ঠটা খুবই সুন্দর।

সে যদি কথাটি তার পৌরুষত্বের দাপট নিয়ে বলত তবে আমি জবাব দিতাম না। কিন্তু দেখলাম এত তার কোন গর্ববোধের স্পর্শ নাই বরং একটা অতলস্পর্শী দীর্ঘশ্বাস। বললাম,

-নাম কি?

-পদ্মা।

-পদ্মা!

-হ্যা। তাইতো আজ পদ্মাপাড়ে। জানো, আমি কাউকে এতটা ভালবাসিনি। আগে দু-একটা প্রেম করলেও কাউকে মন দিতে পারিনি। কিন্তু এ মেয়েটার সাথে কথা বলেই আমার মনটা যেন তার অচেনা চেহারায় মিশে গিয়েছে। আমি একটু চোখ বুজলেই মনে হয় সে আমার পাশে। কথা বললে মনে হয় যেন কথাগুলো আমার ভিতর থেকে আসছে।

মনে মনে বললাম, কবিভাব বটে!

-তারপর?

-তারপর আর কি। কথা শুনে মনে হয় না যে আমার সাথে কথা খেলাপ করতে পারে। আর আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভালবাসতে তা তো স্বপ্নেও ভাবা যায় না।

-তুমি স্বপ্নে না ভাবতে পারো মাসুম তবে একদিন বাস্তবে তা চাক্ষুস দেখতে হতে পারে। এ মুঠোফোনের যুগে মেয়েদের চেহারা না দেখে তার কথা শুনে প্রেমে তুমি পড়তে পারো আমার বিশ্বাস সে পড়বে না।

মাসুম জানে আমি সবসময়ই প্রেম ভালবাসা নিয়ে উল্টো মত প্রকাশ করি। তাই প্রতিবাদ করল না। তবে কথাটা যদি তাকে এখন থেকে একঘণ্টা আগে বলতাম তবে সে ঘোর প্রতিবাদ করত বা বলত, প্রেম ধর্মে নাস্তিক।

হিমালয়ের আদুরে কন্য পদ্মাপাড়ে দাঁড়িয়ে আমরা যে মুঠোফোনের কোন এক পদ্মার জন্য অপেক্ষা করছি সে পদ্মা কি এ পদ্মার চেয়ে কোন অঙ্কে কম নিষ্ঠুর? এ পদ্মা যখন তার তীর ভাঙে পূর্ব থেকেই ফাটল ধরিয়ে হুশিয়ার করে দেয় তটস্থ মানুষদের। কিন্তু এ মুঠোফোনের পদ্মা তো তা করে না। যখন সে তার হৃদয়বিনাশী স্রোতে অপরের ভালবাসার কুল ভাঙতে অভিলাষী হয় তখন সে হুশিয়ার বাণী দেয় না বরং তখনই আরেকটু তীরে বসিয়ে মধুর সুরে দুটি কথা শুনিয়ে দেয়। সে সুরের মূর্ছনায় মাসুমের মত প্রেমিক যখন মত্তকে ভুলতে বসে তখনই সে তার তীরটা ভেঙ্গে নিয়ে ভাসিয়ে দেয় সাগরে লোনা জলে। তখন মাসুম যদি প্রাণপ্রণে দু হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুঠোফোনের বোতাম টিপতে থাকে তখন ফোনের স্কীনে ভেসে আসে, নো রেসপন্স।

আজ অনেকেই পদ্মার সোন্দর্যে মেহিত হয়ে ছুটে যায় পদ্মাপাড়ে। তবে আমি বলি, সেটা মুঠোফোনের পদ্মাই হোক আর কীর্তিনাশাই হোক বিশ্বাস করতে গেলে অবিশ্বাসের সম্ভাবনা যেন কোথাও না থাকে।

মাসুম হাটছিলো সামনে রেখে অতীতের রাত জাগা মুঠোফোনের কিছু মিষ্টি মধুর কথার স্মৃতিকে সামনে রেখে। সেগুলো এখন সম্পূর্ণ তেতো হয়ে না উঠলেও যেন অস্বাদ হয়ে উঠেছে। তার মনে হচ্ছে এতদিন সে একটা মেয়ের সাথে কথা বলেনি যার হৃদয় আছে, কথা বলেছে অপর একটি মুঠোফোনের সাথে যার চার্জ এবং ব্যালান্স থাকলে অপ্রয়োজনেও বকবক করতে পারে কিন্তু চার্জ না দিলে ব্যালান্স না থাকলে কায়মরা হয়ে পড়ে থাকে। আমি তাকে বললাম,

-মেয়েটা হয়তবা ফোন রেখে কোথাও দুরে আছে বা ঘুমিয়ে রয়েছে।

তবে আমি যে কথাটা তাকে সম্পূর্ণভাবে সান্তনা দেবার উদ্দেশ্য বলেছি তা নয়। আমার একটু স্বার্থ সিদ্ধি আছে এর পেছনে তার হল সে যখন ওই মেয়েটার সাথে কতা বলত, আমি কিছু বললে বলত,

-এমন প্রেম একটা করতে পারো বন্ধু? কোনদিনও পারবে না।

মনের সেই খেদটাকে আজ প্রকাশ করলাম তার জ্বালাকে আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে তৃপ্তি পাবার জন্য। যদিও এটা অন্তরঙ্গ বন্ধুর জন্যই বন্ধু করতে পারে।

-ঘুমিয়ে থাকে কি করে? আমি বের হবার সময়েও ফোন দিয়ে বললাম আসো। সে বলল আসছি। ফোন ওর কাছেই আছে। আমার সাথে প্রতারণা করবার জন্যই রিসিভ করছে না।

মনে মনে বললাম, এ কেমনতর ভালবাসা? যাকে এতটা ভালবাসতে পারো তার এ সামান্য ভুলটাকেই প্রতারণা বলে ফেললে। তবে আমি জানি মাসুম তাকে মন থেকেই ভালবাসে। বললাম,

-হয়তবা ফোন রিসিভ না করে তোমার সাথে একটু মজা করছে।

-উঃ এমন মজা আর কোনদিন পাইনি।

বলে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। নদীর বুকে তাকাতে আমার মনে হল মাসুমের দীর্ঘশ্বাসে সেখানে যেন নতুন একটা চর জেগে উঠল।

আমরা যেখান দিয়ে পদ্মাপাড়ে এসেছিলাম সেখানে ফিরে আসলাম। আমরা যে চেয়ার জোড়াটাতে বসেছিলাম দেখলাম সেখানে দুটো ছোট মেয়ে বসে আছে। আমি মনে মনে চেয়ার জোড়াটাকে বললাম, খুব তো সুখ পাচ্ছো আমাদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে। চেয়ার জোড়ার জবান থাকলে হয়তবা আমাকে জবাব দিত, তোমরাই তো আজ আমাদের এ বেলাটা কুফা করে দিয়ে গেলে। মাসুম বলল,

-এখানে আসার কথা বেলা পাঁচটায়, আর? ছি! এমনও হয়।

-চলো। সন্ধ্য হয়ে গেল।

-বন্ধু দুটো সিগারেট নেও তো।

আমি সিগারেট প্রায়ই খেয়ে থাকি তবে মাসুম কোনদিন খায় না বলেই জানি। দোকান থেকে একটি সিগারেট ধরিয়ে মাসুমের হাতে দিয়ে নিজে একটি নিলাম। মাসুম সিগারেটে অপটু হাতে দুটো টান দিয়ে নদীর দিকে ফিরে দীর্ঘশ্বাসে বলল,

-এই পদ্মাপাড়ে!… দোস্ত চলো।

-মাসুম আরেকবার নয়তো ফোন দিয়ে দেখ।

-না, আর দিয়ে লাভ নেই।

-শেষবারের মত একবার দিয়ে দেখো না। যদি ফোনের কাছে এসে থাকে।

মাসুম তার মুঠোফোনে সে নম্বরটি ডায়াল করল। আমাদের মিটার পাঁচেক দূরে পদ্মার পাড়ে বসে যে যুবক যুবতিটি তখন আমাদের উঠে পড়ে আবার বসতে দেখে হেসে উঠেছিল সে মেয়েটি একবার পেছন ফিরে আমাদের দিকে তাকালো। তার পাশের জনকে কি যেন জিজ্ঞাসা করলে যুবক সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। মেয়েটি ব্যাগ থেকে তার মুঠোফোনের বের করে বোতাম টিপে কানের নিকট ধরল। মাসুমের ফোনটিও রিসিভ হল। মেয়েটি মোলায়েম স্বরে বলল,

-এই, তুমি কোথায়? আমি কতক্ষণ ধরে এখানে বসে আছি।

************

In Blog

Author:admin

Leave a Reply