Home লাকী রজব • আলো ছায়া : পর্ব-৭

আলো ছায়া : পর্ব-৭

13631661_1057535304302190_2863327800150460525_n

একটা কচি কণ্ঠের ‘কাক্কু’ ডাকে ঘুম ভাঙল। চোখ মেলে দেখলাম, ফতেমা আমার মাথায় হাত দিয়ে আলোতভাবে চুলগুলো নাড়ছে আর আমাকে ডাকছে। এই অল্প কয়দিনেই আমার সঙ্গে এই মেয়েটির খুব মিল হয়ে গিয়েছে। কারণ, আমি নাকি খুব আদর করি আর সুন্দর সুন্দর গল্প বলি। তার বান্ধবী সুমাইয়ার সাথেও আমার খুব মিল উঠেছে। এটা অবশ্য ফতেমার কচি মনে একটু অভিমানের উদ্রেক করে। সে বলে, কাক্কু এখন খালি সুমাইয়ারেই আদর করেন। সুমাইয়াও এর সুন্দর জবাব দিতে জনে। বলে, ডাইভার কাক্কু আমার ছেলে। সে তার জামা উঁচু করে পেটটি দেখায়, আমাকে নাকি সেখানে অনেকদিন রেখেছিল। তাই আমি কার ছেলে এ নিয়ে ফতেমা আর সুমাইয়ার মধ্যে ঝগড়া হয় তবে সেটা আপসের। আমাকে চোখ মেলতে দেখে ফতেমা বলল,
-কাকা, ঘুম থেকে উঠবেন না?
-কি বলো আম্মু?
-বেলা উঠে গেছে, আর কত শুয়ে থাকবেন। আব্বু আপনেরে ডেকে গেছে।
আব্বাস মিয়ার ডাকার কথা শুনে গাঁ ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লাম।
-তুমি এখন কোথায় যাবা?
-লিমা ফুপুর কাছে পড়তে যাব। আমার আর সুমাইয়ার আজ বিপদ আছে। কালকে ফুফু অঙ্ক দিছিলো, না পারলে মার খেয়ে পেট ভরে যাবে।
-তাহলে তো ভালই হবে আর ভাত খাওয়া লাগবে না।
-হু, আমি চিন্তা করছি কার কাছ থেকে করে নেব। ভাইয়াও পারে না। কি যে বিপদ।
-দেও আমি করে দেই।
-পারে না, আবার কয়।
-দেও তো দেখি।
ফাতেমার অঙ্ক চারটি করে দিলাম, বিয়োগ অঙ্ক। আমি যে কলম ধরতে পারি বা লিখতে পারি, ফতেমার তা বিশ্বাস হত না। এখন আমাকে অঙ্ক করতে দেখে রীতিমত অবাক হল। অঙ্কগুলো তাকে সহজভাবে বুঝিয়ে দিলাম। তারপর ঐ ধরনের অঙ্ক সে একাই করতে পারল। ফাতেমা মার খাওয়ার চিন্তা থেকে বেঁচে গিয়ে বলল,
-কাক্কু আপনে যে কত ভাল।
আজ প্রায় দশ বার দিন হল এ বাড়িতে থাকছি। এর মধ্যে অনেকবার লিমার সঙ্গে চোখে চেখে সংঘর্ষ হয়েছে। তবে সে সংঘর্ষে আগুনের ফুলকি ছিটকে পড়েনি। কি- বা কিসের ফুলকি যেন ছিটকাতে যেয়েও উজ্জল হতে পারেনি। আজ ভাবলাম ফাতেমার খাতায় যখন অঙ্ক করে দিয়েছি তাহলে এখানে কিছু লেখার আমার সুবর্ণ সুযোগ যায়। তাই অঙ্কের নিচে সামান্য জায়গায় লিখে দিলাম,

ফাতেমার শিক্ষিকা,
ফাতেমার খাতার অঙ্কগুলো এক ভবঘুরে আহাম্মক করে দিয়েছে। ভুল হলে হতেও পারে, ক্ষমা করে ধন্য করবেন।
ইতি,
আপনারই একরকম ছাত্র।

বাস্তবিকই একটা অঙ্ক আমি ইচ্ছা করেই ভুল করে দিয়েছিলাম। কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম, আমার লেখার উপর কলম ধরার মত পরিস্থিতি লিমার ছিল না। সে শুধু পাশে অঙ্কটা সঠিক করে করে দিয়েছিলো। ফাতেমা প্রাইভেট থেকে ফিরে এসে বলল,
-কাকা, ফুফু আপনার লেখা দেখে খুব অবাক হয়েছেন। আপনার লেখা নাকি খুব সুন্দর। আমার খাতায় আবার কি জানি লিখে দিছেন ইংলিশ দিয়ে।
লিমার লেখাটি এই,

‘If you want to be my student, you will come tomorrow to me with your book and pencil’

তার এই লেখাটা ইংরেজী দিয়ে লেখা দেখে আমার মনের মধ্যে অনেকটা হাসি পেল। এর উদ্দেশ্য হয়তবা- আমার বিদ্যার পরিমাপ করা। পরদিন ফাতেমার খাতায় লিখে দিলাম,

Honurable Madam,
I want to be your student with my heart. If you agree with me with this propose, I will be your student through my whole life.
Yours obedient student.

এ লেখা পড়ে লিমা যতটা অবাক হল তা শুধু সেই জানে। বিকালবেলা সলমান প্রামাণিক আমাকে ডাকল। আমার হৃদপিণ্ডের কম্পন তখন হাজার বারের বেশি। কারণ, চোরের মন পুলিশ, পুলিশ। আমার ভয়, আমার এই লেখালেখির খবর প্রামাণিকের কানে পৌছেছে। অতীত জীবনের দুঃখ কষ্টের কাহিনীই আমার জীবন কেতাবের পাতা পূর্ণ করে রেখেছে। আজ আবার দুঃখদায়ক কিছু, মানে কপালে অর্ধচন্দ্র একে নিয়ে প্রামাণিকের বাড়ি ছাড়তে হলে, এই ঘটনাটা কোথায় যে স্থান পাবে তাই নিয়ে ভাবতে লাগলাম। কিন্তু না, মানুষ যা ভাবে, বিশেষত আমি যা ভাবি তার উল্টোটাই বেশিরভাগ ঘটে থাকে। প্রামাণিক আমাকে ডেকে বলল,
-আজ এই দেড় হাজার টাকা নাও, নিয়ে তোমার কাপড় চোপড় যা যা দরকার কর। আর বাকি টাকা মাস শেষ হলে দেব। তুমি যেভাবে হেরো চালাচ্ছো তাতে খুব ভালই হচ্ছে, এমনেই কাজ করবে আর থাকবে।
প্রামাণিকের সামনে থেকে ছাড়া পেয়ে গোটা কয়েকবার ঈশ্বরের শুকরিয়া জানালাম। আমার ভয় পাবার একটাই কারণ ছিল, ফাতেমার খাতায় পাণ্ডিত্যর প্রকাশ।

পর্ব- ৮ 

Author:luckyrazob

Leave a Reply