Home লাকী রজব • আলো ছায়া : পর্ব- ৩

আলো ছায়া : পর্ব- ৩

শরিফের মা, এ ছেলেটা এখনতে আগের ড্রাইভারের মত শরীফের সাথে থাকবে, আর তোমাদের ঘরে খাবে।
-আচ্ছা।
বলে শরিফের মা আমাকে ডাক দিল,
-আসো ভাই এদিকে আসো। তোমার নাম কি?
বললাম।
-বাড়ি কোথায়?
বললাম।
-আগে বাড়িতে কি করতে, বাবা মা নাই?
-আছে। এইতো টুকটাক কাজ করতাম।
-তো এতদূর আসছো কাজের জন্য?
বললাম। তারপর বলল,
-আমার দুইটা মেয়ে, আর একটা ছেলে। বড় মেয়েটি বিয়ে দিয়ে দিয়েছি আর একটা ছোট। ছেলেটার নাম শরিফ, ওর সাথেই আগের ড্রাইভার থাকত। শরিফ এখন মাঠে গেছে গরু আনতে।
শরিফ নামের ছেলেটি কতকগুলো গরু তাড়তে তাড়তে নিয়ে আসলো। আমার দিকে একটু অবাকভাবে তাকিয়ে গোয়ালের দিকে চলে গেল। গরু বেঁধে এসে তার মাকে জিজ্ঞেস করল,
-এ লোকটা কে?
-একে তোর দাদায় ড্রাইভার রাখছে। ওরে তুই কাকা বলে ডাকবে।
মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে স্যান্ডেল নিয়ে হাত পা ধুতে চলে গেল। বার-তের বছর বয়স হবে ছেলেটির। আমকে জিজ্ঞাসা করল,
-কাকা, আপনার বাড়ি কোথায়?
বললাম।
-হাত পা ধুবেন না?
তার মা বলল,
-যাও ভাই হাত পা ধুয়ে আসো, সন্ধ্যা হয়ে গেল।
হাত পা ধুয়ে আসলাম। ততক্ষণে সূর্য ডুবে তার লালিমা টুকো দেখা যাচ্ছে। একটি ছোট মেয়ে চোখ ডলতে ডলতে ঘর থেকে বের হল। শরীফের মা মেয়েটাকে ডেকে বলল,
-মা ফাতেমা, ছাগল তিনটা ঘরে নিয়ে বাঁধো।
আট নয় বছর বয়স হবে মেয়েটির। আমার দিকে তাকিয়ে অবাক হল। পরে তার মায়ের কাছ থেকে সব শুনে নিল। আধার ঘনিয়ে আসলে শরিফের মা ভাত বেড়ে আমাদের ডাক দিল। ততক্ষণ শরিফের সাথে গল্প করছিলাম। এ অল্পক্ষণেই ছেলেটির সাথে আমার মিল হয়ে গেল। খেয়ে উঠলাম, স্বাভাবিক ধরনের খাবার-ই। শরিফ তার মায়ের সাথে নানা বিষয়ে আলাপ করছিলাম। শরিফের মা বলল,
-শরিফের বাপ বাজারে গিয়ে কার সাথে জানি গল্পে পড়ছে।
এমন সময় শরিফের বাবা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
-গল্পে তো পড়ব-ই। আমার বাজারে গিয়ে তার পরে তো আসা লাগবে—
আমাকে দেখে থেমে গেল। শরিফের মায়ের থেকে সব শুনে নিল। মহিলাটি কোন কিছু খুব সুন্দর ভাবে বর্ণনা করতে পারে। শরিফের বাবা বলল,
-তো ডাইভার রাখছে যখন থাকো। আগের ডাইভারও আমার বাড়িতে থাকতো। তুমিও থাকবা আর হেরো চালাবা। আমি চাচার সব গারস্থ কাজকর্ম তদারক করি আজ প্রায় চৌদ্দ-পনের বছর হল। কোন জমি কখন চষা লাগবে কোন ফসল আবাদ করতে হবে সব আমিই জানি। চাচা শধু খোঁজ খবর নেয়। চাচার প্রায় চল্লিশ পয়তাল্লিশ বিঘা ফসল আবাদ করার মত জমি আছে। সব এক হোরো দিয়েই চাাষ দেওয়া হয়। তাই চাচায় একবারে বাড়িতে ড্রাইভার রেখে নেয়।
বাইরে থেকে সে লোকটি, লোকটি বললে ভুল হবে শরিফের মায়ের নিকট থেকে তার নাম শুনেছি- সলমান প্রামাাণিক। ডাক দিল,
– শরিফের বাপ বাড়িতে আসছে নাকি?
-হ্যা চাচা আসছি, আসেন।
-হপারের তেল কতখানি আনছো?
-দশ লিটার। দশ লিটারে আর কি হবে।
বলতে বলতে ঘরে ঢুকল। আমকে বলল,
-খাওয়া দাওয়া করছো?
-হ্যা চাচা করছি।
-হ, পেট ভরে খাবে আর মন দিয়ে কাজ করবে। শরিফের বাপ যেদিন যে খেত চাষ দিতে বলবে সেদিন সে খেত চাষ দিবে।
মাথা নেড়ে সায় দিলাম। শরিফের বাবা বলল,
-ভাল করে ঠিকমত চালাতে পারো-তো?
আমি কিছু বলার আগেই সলমান প্রামাণিক বলল,
-হ্যা পারে, খুব সুন্দর করেই চাষ দিতে পারে।
-পারলেই তো ভাল।
বলল শরিফের মা। প্রামাণিক শরিফের বাবাকে বলল,
-আগামী কাল কি খেত চষার আছে?
– না। কালকে নাই। তবে পরশু দিনতে চাষ শুরু করা লাগবে। কাল পশ্চিম মাঠের খেসারি বাড়িত নিয়ে আসলে পরশু দিনতে শুরু করতে হবে।
-আচ্ছা। কাল না থাকে তো কালকে ঘুুরে ফিরে আমার জমিগুলো চিনে নিবে নে।
শরিফের বাবা সায় দিল। তার ভাত খাওয়া হওয়া পর্যন্ত তাদের সঙ্গে গল্প করলাম। প্রামাণিক চলে গেলে শরিফের সাথে শুতে গেলাম। দো-চালা টিনের একটা মাঝারি আকারের ঘর, শোলার বেড়া। তারা সবাই একে বাংলা ঘর বলে। ঘরটি বাড়ির দক্ষিণ পশ্চিম কর্ণারে। শরিফের সঙ্গে শুয়ে শুয়ে কিছুক্ষণ গল্প করলাম। বাতি নিভিয়ে শরিফ ঘুমিয়ে পড়ল। ভাবলাম, হায়রে নিয়তির খেলা! গতরাত্রে আমি একটা উদ্দেশ্য বিহীন অপরিচিত একটা দোকানের মাচায় শুয়ে রাত কাটিয়েছি। আর এখন আমার একটি অবলম্বন আছে, একটা ভরসা আছে, একটা কাজ আছে। আমার জীবনের অতীতের কিছু স্মৃতি আর
আজকে এই বাঁশের মাচায় শুয়ে থাকার কথা আমাকে বড়ই ভাবুক করে তুলল।

পর্ব- ৪

Author:luckyrazob

One response to  “আলো ছায়া : পর্ব- ৩”

Leave a Reply