Home লাকী রজব • আলো ছায়া : পর্ব- ১৮

আলো ছায়া : পর্ব- ১৮

14199240_1090821474306906_2669366019056311844_n

জমি চাষ দিতে দিতে একটা গান ধরলাম, যদিও আমার গানের কণ্ঠটা আমার কাছেই উদ্ভট লাগে। মাথার উপর জ্বলন্ত সূর্য, নিচে ধুলার মত শুষ্ক মাটিতে টিলার চলছে। শুষ্ক বাতাস ধুলাবালি নিয়ে খেলা করছে। অবশ্য এ জন্য আমার সতকর্তাও যথেষ্ট। মাথায় চড়িয়েছি সেই তেল চিটচিটে ক্যাপটা, চোখে মডেল বিহীন একটা চশমা।

বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছি। একবার দেখলাম, দুটি বোরখা রাস্তা ধরে হেটে আসছে। তাড়াতাড়ি মেশিন বন্ধ করে গাছের নিচে এসে দম নিতে বসলাম। মাঠেও লোকজন নেই, অনেকদূরে একটি টিলার চলছে। আমি যাদের জন্য অপেক্ষা করছি তারাই। দুজন দূর থেকে হাসতে হাসতে গল্প করতে আসছিলো কিন্তু আমার নিকটে এসে একেবারে ভদ্র মহিলার মত চুপ করে পাশ কেটে চলে যাচ্ছিল। এ তো সুযোগ চলে যায়রে, এরকম সুযোগ তো আর পাওয়া দুষ্কর। তাই জড়তা দেবীকে দু-পায়ে লাথি মেরে দূর করে দিয়ে বললাম,
-এই যে আপুরা একটু শুুনুন।
স্বপ্না জবাব দিল,
-আমাদের কিছু বলছেন?
-হ্যা, একটু দাঁড়ান।
-দাঁড়িয়েই তো আছি কি দরকার বলুন।
-দরকার তেমন কিছু নয়, একটু পরিচয় হতে ইচ্ছা হয় তাই।
-আমাদের পরিচয় নিয়ে আপনার কি লাভ?
-লাভ না থাকলেও দরকার আছে বলে মনে হয়।
-আমাদের তো কোন দরকার নেই, আর আপনি নিশ্চয় আমদের চিনেন। জেনেও এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমাদের পরিচয় জানতে চাওয়াটা কি ঠিক?
এর সঙ্গে আলাপ করে তো সুবিধা হবে বলে মনে হচ্ছে না। আর আমি যেভাবে কথা শুরু করেছি তা ব্যাতিত আর কিভাবে শুরু করলেই বা ভালো হত। যাক যা হবার তা হয়েছে। আমি ভেবেছিলাম তারা হয়তবা আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে চলে যাবে। একটা মস্ত কঠিন কাজ থেকে আজকের মত এখানেই রেহাই পাব। কিন্তু না, দেখি তারা আমার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে। আবার বললাম,
-আপনার দরকার না থাকলেও আপনার পাশের জনের তো থাকতেও পারে।
-তাহলে ওর সঙ্গেই আলাপ করেন আমাকে বলেন কেন?
এবার একটু দৃঢ় স্বরে বললাম,
-আমি তো কাউকে ইন্ডিকেট করে ডাক দেয়নি, আপনি কথা বলছেন, তাই বলছি।
সে একথা শুনে অপ্রতিভ হয়ে গেল। লিমা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আমাদের বাক বিত-া শুনছিলো, কিছুই বলেনি। এবার বলল,
-এই তুই চুপ করতো সবার সঙ্গে একভাবে কথা বলতে হয়।
স্বপ্না রাগে ফুলতে ফুলতে বলল,
-সবার সঙ্গে? কার সঙ্গে? ইনি আবার কে? তোদের বাড়ির ড্রাইভারটা না?
কথাটা লিমার মনে প্রচ- আঘাত করল। সে সেদিকে লক্ষ না করে আমাকে বলল,
-আপনি আমাদের পরিচয় জানতে চাইছেন, আপনার পরিচয়টা আগে শুনি।
আমি একজন অপরিচিত ব্যাক্তির মতই বললাম,
-আমি মোঃ শফিকুল ইসলাম, আপনাদের বাড়ির ড্রাইভার। এছাড়া আমার আর বিশেষ কোন পরিচয় নেই।
স্বপ্না একবার বলতে চেয়েছিল, ওদের বাড়ির নয় শুধু ওদের টিলারটার। কিন্তু লিমা কথা বলতে শুরু করায় সে চুপ করে গেল। লিমা বলল,
-আমার নামটাতো আপনার জানাই আছে।
স্বপ্না এবারও কিছু বলতে গিয়ে ব্যার্থ হল।
-ওর নাম স্বপ্না, আমার চাচত বোন।
-আপনারা কোথায় লেখাপড়া কারেন?
-পীরগঞ্জ ডিগ্রী কলেজে, ইন্টারমিডিয়েটে।
-কোন ইয়ারে।
আমার এ প্রশ্নটা শুনে স্বপ্না অবাক হল। তার ধারণা ছিল, আমি একজন গ-মূর্খ ড্রাইভার ব্যাতিত কিছু নই। কিন্তু আজকের কথাবার্তায় বিশেষত এ প্রশ্নে তার ধারণা পাল্টে গেল। লিমা জবাব দিল,
-ফার্স্ট ইয়ারে।
তার প্রতিটি কথাই আমার কানে যেন অমৃতের মত প্রবেশ করছে। তাই তার মুখ থেকে আরো কিছু শোনার জন্য জিজ্ঞাসা করলাম,
-আগে কোথায় পড়তেন?
-করিমগঞ্জ হাইস্কুলে, ওখান থেকে পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েছি।
-আপনারা কোন বিভাগের ছাত্রী?
এ প্রশ্নটা স্বপ্নাকে আরো অবাক করে দিল। লিমা বলল,
-বাণিজ্য বিভাগের।
-দু-জনেই?
স্বপ্না এবার সুযোগ পেয়ে চাপা স্বরে বলল,
-জ্বি–ই।
লিমা বলল,
-আরো কিছু জানতে চান?
বলে মিটমিট হেসে আমার দিকে তাকালো। আমিও তাকাতে চোখাচেখি হল। চোখে চোখ রেখেই বললাম,
-আজ আর তেমন কিছু না, আপনাদের সময় নষ্ট করলাম বলে দুঃখিত, ক্ষমা করবেন। আরেকদিন আবার…।
কথা শেষ না হতেই স্বপ্না লিমাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে চলে গেল।
যেতে যেতে স্বপ্না বলল,
-লোকটা বুঝি লেখাপড়াও জানে রে?
-হ্যা। আমার তো মনে হয় খুব শিক্ষিত।
সে লিমার কাছ থেকে এতটা প্রশংসা আশা করেনি। তাই তিরস্কার করে বলল,
-হায়ার এডুকেডেট।

Author:luckyrazob

Leave a Reply