Home লাকী রজব • আলো ছায়া : পর্ব- ১৭

আলো ছায়া : পর্ব- ১৭

14192802_1087222034666850_6408746899092373090_n

খাতা খুলে দেখলাম, একটি প্যাড সুন্দর ভাবে ভাঁজ করে খাতার সাথে পিন মারা। খুলে পকেটে নিলাম। ফাতেমা তা দেখতে পেল না। দুই মিনিটে অঙ্কগুলি করে দিয়ে ফাতেমাকে বিদায় করলাম। প্যাডটা চার পাঁচটি পিন দিয়ে আটকানো। আমি কেবলি একটা পিন খুলছি এমন সময় আব্বাস মিয়া ডাক দিয়ে ঘরে ঢুকল,
-কি করো? মাঠে যেতে হবে তো।
আমি তাড়াতাড়ি কাগজটা সামলে নিয়ে বললাম,
-এইতো যাচ্ছি।
সে জিজ্ঞাসা করল,
-ওটা কি?
-ঐ একটা কাগজ আয়নার সাথে ছিল।
তার তাকানোর ভাবে মনে হল, সে কথাটা বিশ্বাস করতে পারে নাই। তার সঙ্গে সঙ্গেই ঘর থেকে বের হয়ে মাঠে চলে আসলাম। এটা প্রামাণিকের সবচেয়ে দূরের জমি। কিছুক্ষণ পর আমার সেই কাগজটার কথা মনে পড়ল । ওহ শিট! সেটাকে না বালিশের নিচে রেখেই চলে আসছি। আমার এটুকোও খেয়াল হল না। আমি নিশ্চিত আব্বাস মিয়া বাড়ি গিয়েই সেটা খুলে দেখবে। সে পড়তে না জানলেও শরিফকে অথবা রহমত আলী বা তার বউকে এমনকি লিমাকে দিয়েও পড়াতে পারে!
আর কাগজটা যেভাবে পিনআপ করা তা দেখলে সবারই কৌতুহল জাগবে এর ভিতরে কি আছে দেখার জন্য। কি-বা লিখেছিল লিমা এর ভিতরে, আমার জীবনের প্রথম প্রেম পত্রের সে কি-ই বা জবাব দিয়েছিল। সে সেই শুন্যস্থানটি পূরণ করেছিল কি-না।
সব চিন্তার শিরোমণি হয়ে একটি দুশ্চিন্তাই আমাকে সবচেয়ে বেশি হানা দিয়ে গেল, ধরা পড়া। আর ধরা পড়লে যে এ বাড়ি আমাকে ছাড়তে হবে তা অবধারিত। আমার সঙ্গে লিমার চিঠি দেওয়া-নেওয়া এটা যে কত খারাপ ঘটনা হিসেবে প্রামাণিকের বাড়ির লোকজন মনে করেবে তা ভাবতে আমার মাথা ঘুরে গেল। আর এ বাড়ি ছাড়তে হলে তো আমার প্রথম স্বপ্ন প্রথম সাধনা প্রথম প্রেম লিমাকে ছেড়ে চলে যেত হবে। এ চিন্তাটাই আমার মনে সবচেয়ে বেশি দোলা দিল। বেলা পড়লে বাড়ি আসলাম। এসেই আগে কাগজটার খোঁজ নিলাম। আমি যে রকম রেখে গিয়েছিলাম সে রকমই আছে দেখে সারাদিন পর একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে কাগজটা পকেটে লুকিয়ে রাখলাম। ভাবলাম, গোসল খাওয়া দাওয়া করে ফ্রেশ হয়ে তারপর খুলব। এখন আমার মন আনন্দে নাচতে লাগল। সে আনন্দের তালে তালে গোসল খাওয়া দাওয়া করলাম। শার্টটা গায়ে ফেলে প্রামাণিকের বাড়ির উত্তর দিকে যে বাগানটা আছে সেদিকে চলে গেলাম। প্রামাণিকের বাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম লিমা গেটের ওখানে দাঁড়িয়েছিল আমাকে দেখে ভিতরে চলে গেল। একটা অজানা পুলকে আমার মন ভরে গেল আবার একটু ভয়ও হল। হাটতে হাটতে মনে হল, এই বাগান নিয়েই তো সেদিন স্বপ্ন দেখে ছিলাম। আজ যদি বাস্তবেই লিমা আমার সাথে আসত!

বিঘা চারেক জমিতে আম, কাঁঠাল, লিচু প্রভৃতির গাছ। বাগানের শেষে মাঠের সীমান্তে এসে দাঁড়ালাম। সূর্যদেব ততক্ষণে রক্তিম হয়ে আজকে দিনের তার কর্তব্য শেষ করে বিদায় নেয়ার উপক্রম করছে । কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত শুন্য মাঠের ওপারে এই যৌবনাহারা বৃদ্ধ দিনমনির দিকে তাকিয়ে রইলাম। হটাৎ কাগজটার কথা মনে হতে পকেট থেকে বের করলাম। লিমার লেখা চিঠি, লিমার কোমল হাতের ছোঁয়া যাতে লেগে রয়েছে। তা ভেবে অন্ধের মত কিছুক্ষণ কাগজটাকে চুমু খেলাম। কিন্তু কাগজটি বড়ই খসখসে, লিমার ঠোটের মত এত টুকোও কোমল নয়, তাই জিহ্বায় রস আসল না। উৎসাহভরে যতেœর সাথে কাগজ থেকে পিনগুলো তুললাম। আশপাশে একবার তাকিয়ে দেখে নিলাম, কেউ আছে নাকি? কেউই নাই দেখে কাগজটা খুললাম। কিন্তু কাগজটার উপর আমার দুই চক্ষু অনেক অনুসন্ধান করেও কলমের এতটুকো স্পর্শ আবিস্কার করতে পারল না। বারবার এপিঠ ওপিঠ উল্টে দেখলাম, জল ছাপে রেখাঙ্কিত একটি সাদা কাগজ। কাগজটা আবার ভাজ করে পকেটে ফেলে বাড়ি আসলাম। পরদিন ফাতেমা প্রাইভেট থেকে ফিরে বলল,
-কাক্কু ফুফু কয়টা অঙ্ক দিয়েছে না পারলে, বলছে আপনার কাছ থেকে বুঝে নিতে।
অঙ্কগুলো ধরে দেখলাম, সেগুলো আদৌও ফাতেমার পারবার কথা নয়। খাতার ভিতরে পৃষ্ঠা উল্টাতে গিয়ে দেখলাম, গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,

প্রিয় মানুষ,
সালাম নিবেন। পার্থিব কোন জিনিস দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে আপনাকে অবহেলা করতে চাইনে। তাই আমার যে জিনিসটি আপনাকে একান্তই আপন করে পেতে চায়, তা দিয়েই শুভেচ্ছা জানালাম। সেটা হল হৃদয়।
আপনি প্রায় দু-মাস হল আমাদের বাড়িতে এসেছেন একজন ড্রাইভার হিসেবে, কিন্তু আপনি কি জানেন আমার হৃদয়ে আপনি স্থান পেয়েছেন কি হিসাবে? আপনি যখন আমাদের বাড়িতে আসেন তখন আপনার চেহারা ছিল প্রায় একাজন ছন্নছাড়া পাগলের মত। কিন্তু আপনার এ আনমনা বেশটাই আমার মন কেড়েছে। আপনার সঙ্গে আমার বেশকিছু দিন সাক্ষাৎ হয়েছে তবে আপনিও তেমন কিছু বলেননি, আমিও না। আপনি বলেছেন, আমার সামনে আসলে নাকি আপনার মুখের ভাষা হারিয়ে যায়। আমারও যে অনুরুপ অবস্থা হয় তা কি আপনি বুঝতে পারেন না? কথায় বলে না, মেয়েদের বুক ফাটে তবু মুখ ফাটে না। আপনার চালচলন কথাবার্তায় মনে হয় না যে আপনি একজন শ্রমিক। আমার মন প্রাণ বলে আপনি একটি ভদ্র ঘরের ছেলে, একজন শিক্ষিত মানুষ। আপনার এই রহস্যময়তা আমাকে পাগল করে তুলেছে। আপনাকে আমি কখনও একজন ড্রাইভার হিসেবে ভাবতে পারি না। আপনি আমার মনোরাজ্যোর অদ্বিতীয় রাজা। আমি আপনাকে ভালবাসি, পাগলের মতই ভালবাসি। চোখ বুজলেই মনে পড়ে আপনার হাসিমুখ। আমি লক্ষ করেছি আমাকে দেখলে আপনি অনেকটা নার্ভাস হয়ে যান, যা আর কেউই হয় না। আমার আপনার প্রেম হয়তবা আমার পরিবার, সমাজ মেনে নিতে চাাইবে না তবে মনে রাখবেন, আপনি যদি আমাকে ভালবাসেন তাহলে শত প্রতিকুলতাও আমাকে রুখতে পারবে না। ফাতেমার খাতায় আপনার লেখা আমাকে অভিভূত করেছে। আর গতকাল যে সাদা কাগজটা দিয়েছিলাম তা কোন উদ্দেশ্য নিয়ে নয় এমনিতেই। যাই হোক আশা করি আমার এ প্রেম নিবেদন আপনি বিমুখ করবেন না, গ্রহণ করবেন। আমার জীবনের প্রথম স্বপ্ন পূরণ হবে। আই লাভ ইউ মাই ডিয়ার শফিকুল, আই লাভ লাভ ইউ।
ইতি
আপনারই প্রেমাকাঙ্খীনি
লিমা ।
ফাতেমার খাতা থেকে পৃষ্ঠা টুকো ছিঁড়ে পকেটে নিলাম। মনে হল, আজ জগতের সবচেয়ে সুখী আমি! লিমার হাসি মুখটি বারবার আমার চোখের সামনে ভেসে আসলো।

পর্ব- ১৮ 

Author:luckyrazob

Leave a Reply