Home লাকী রজব • আলো ছায়া : পর্ব- ১১

আলো ছায়া : পর্ব- ১১

snap-2016-12-11-at-22-48-43

পরেরদিন সকালবেলা উঠি উঠি করে উঠা হচ্ছে না। নিদ্রাদেবীর উপাসনা করে যেন তৃপ্তিই মিটছে না। কিন্তু নিদ্রাদেবীর চেয়ে অধিক মোহিনী শক্তিধারী এক দেবী যখন আমার ঘরে প্রবেশ করল, নিদ্রাদেবী তখন লজ্জায় পলায়ন করল। চোখ মেলে ভূত দেখার মত চমকে উঠলাম। দেখি, সাহেরার সাথে লিমা আমার ঘরে দাঁড়িয়ে। লিমা ডিম নিতে এসেছে। ঘরের কোণায় ডোলের উপর একটি মুরগি ডিম পাড়ে, শরিফের মা সে ডিম নিচ্ছে। লিমা সাহেরাকে বলল,
-ডাইভার সাহেবের তো দাঁতে রোদ লাগল। তাও তো ওঠে না। গায়ে পানি ঢেলে দেব নাকি?
তার এ কথা শুনতে শুনতে আমি হুড়মুড় করে উঠে বসে পড়লাম। আমি যখন শুয়ে ছিলাম, আমার শেভিং করা মুখ ছাঁটা চুলের দিকে তাকিয়ে লিমা যথেষ্ট অবাক হয়েছিল। এখন আমাকে উঠে বসতে দেখে ডিমের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। সাহেরা বলল,
-কই পানি ঢাললি না?
-না, ঢালার কথা শুনেই উঠে পড়ছে।
-তাহলে পানি এনে দে, চোখ ধুক।
-হু, আমার ঠেকা।
সাহেরা লিমার কথা শুনে সম্বিৎ ফিরে পেল। সে বুঝতে পারলো যে কাদের নিয়ে কথা বলছে। লিমা যে প্রামাণিকের আদরের দুলালী আর আমি যে এক ভিনদেশী ড্রাইভার তা ভেবে সে আর আমাদের নিয়ে কথা বলল না। যদিও অনেক কথাই বমি আসার মত তার পেট থেকে উগলে আসছিলো। সে সেটা সামাল দিয়ে বলল,
-ডিম কয়টা নিবি?
-মা বলছে দুই হালি দিতে।
আগেই বলছি, ভুত দেখার মত চমকে উঠছি। আমি অবশ্য অশরীরী ভূত কোন দিন দেখিনি কিন্তু আজ এই শরীরী ভূত ঘরের ভিতর দেখে মাচার উপর বসে হৃদপিণ্ড কাপাচ্ছি আর ঘামছি, যদিও সকালবেলা। এ অবস্থায় আমার মুখ দিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে কোন বক্যে নির্গত করা সম্ভব নয়। ঘর থেকে বের হবার সময় লিমা আমার দিকে ফিরে তাকালো। আমি কিছু বলতে প্রাণপ্রণ চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। হাজারো কথা একবারে আমার মুখ দিয়ে বের হবার জন্য দৌড়ে আসল। কাকে রেখে কাকে যে উচ্চারণ করব তা ভাবতে ভাবতে লিমা হাসিমুখ দেখিয়ে চলে গেল। আমাদের এ ভাবটা শরিফের মায়ের কাছে বড়ই দুর্বোধ্য ঠেকল। কিছু বুঝতে না পেরে আমাকে শুধু বলল,
-হতমুখ ধুয়ে হেরো নিয়ে মাঠে যাও, বেলা হয়ে গেছে।
এ কথাটা শরিফের বাবার মুখে মানানসই হলেও শরিফের মায়ের মুখে যেমনি বেমানান তেমনি অর্থহীন। সে আমাকে এমন কথা কোন দিন বলেও নি। শরিফের মা না বললেও আমি ঘর থেকে বেরিয়ে আসতাম। মাচা থেকে নিজের অজান্তেই নেমে গিয়ে স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে বের হয়ে আসলাম। লিমা সাহেরাকে ডিমের দাম জিজ্ঞাসা করছে। সাহেরা বলছে, টাকা দেয়া লাগবে না। আমি ঘরের চাল থেকে খেজুর গাছটি পেড়ে নিয়ে দাঁতে ধার দিতে লাগলাম। কারণ, শরিফের মা আজ ঢেঁড়স ভর্তা করবে। ফাতেমা আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে খিল খিল করে হাসতে লাগল। কিছুই বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাম,
-হাসো কেন ফাতেমা?
-আপনার স্যান্ডেল—-।
আমি ভাবলাম, স্যান্ডেল হয়তবা খারাপ হযেছে তাই সে হাসছে। খারাপও তো হবার কথা নয়। স্যান্ডেলের চোহারা মোবারক দর্শন করার জন্য পায়ের দিকে তাকালাম। পায়ের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় আর মাথাটা উচু করতে পারলাম না। দেখি, বাম পায়ের স্যান্ডেলটা ডান পায়ে, ডান পায়েরটা বাম পায়ে। ততক্ষণে লিমা, সাহেরা সবার দৃষ্টি আমার স্যান্ডেলের দিকে। তারা হেসে উঠল। লিমা বলল,
-তোর কাকার দামি স্যান্ডেল তো, তাই উল্টা করে পায়ে দিতে হয়।
বলে সে উঠল। এই কথা শুনে হাসি ঠেকানোর মত পৌরুষত্ব আমার এখনো অর্জিত হয়নি। তাই নিজের বোকামি টাকেই গৌরবের কাজ বলে মনে করে একটু গা জ্বালানো হাসি হাসলাম। লিমা ডিম নিয়ে চলে যাচ্ছিল। হাসি থেমে গেলে গেলে তার মুখের আভাটা যেন আমাকে পাগল করে তুলল। এবার কিছু বলতে গিয়ে কথাগুলো পেটের মধ্যোই ঘোরপাক খেলো, কণ্ঠ পর্যন্তও এগিয়ে এল না। কলে মুখ ধুতে এসে দেখলাম লিমা প্রায় তাদের গেটের নিকট চলে গেছে। সেখান থেকে সে একবার ফিরে তাকালো। নিজের অজান্তেই হাতটা উঁচু করে তাকে ফিরে আসতে ইশারা করলাম। এবার সে একটু মুখ ভেংচি করে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। তখন আমি আমার আপন সত্তাকে ফিরে পেলাম। বুঝতে পারলাম, সেদিন ফাতেমার খাতায় দেয়া আমার ‘আহাম্মক’ উপাধিটি আজ সার্থকতা লাভ করল। হাত মুখ ধুয়ে এসে ফাতেমার আয়নায় মুখ দেখে চুলে একটু লাঙল চালিয়ে টিলার নিয়ে মাঠে যাবার জন্য প্রস্তুত হলাম। ভাবলাম, একটি আয়না, চিরুনি, ও স্নো জাতীয় কিছু কেনা আমার জন্য প্রস্তুত ফরয। কিন্তু লিমার কথা মনে হলে মনে হল, শুধু ফরয নয় ফরযে আইন।

আব্বাস মিয়া কোথা থেকে যেন গায়ে কাদা নিয়ে বাড়ি আসলো। হাতের কাদা মাখানো গামছায় কতগুলো মাছ বাঁধা। উঠানে এসে শরিফ, শরিফের মাকে উৎসাহের সঙ্গে ডাকতে লাগল। আমাকে দেখে বলল,
-শরিফের মা কই?
সাহেরা ঘর থেকে বের হয়ে বলল,
-কি হয়েছে, সকালবেলাই কোনতে কাদা মাখায়ে কামাই করে আসছে।
-আরে দেখিস না কতগুলো মাছ ধরছি।
-তো আমি এখন কি করব, নাচব?
-নাচবি না ডিস্কো দিবি তা জানিনা, তাড়াতাড়ি বড় পাতিল, ডিস আর চারুটা বের কর। যে মাছ দেখে আসছি।
-এ নেরে তোরা বস্তা থামা নে আজকে বিলের মাছ সব মেরে নি আসব।
তারা বেশির ভাগ সময় এ ভাবেই কথা বলে। তবে কারও কথায় কেউ সহজে রাগ করে না। আব্বাস মিয়ার হাকডাক শুনে ও বাড়ি থেকে শরিফ, প্রামাণিক, রহমত আসলো। শরিফ গামছা খুলে মাছগুলো খুলে মাছগুলো বের করল। আসলেই ভাল মাছ- কই, টাকি, সিং, বাইন দিয়ে প্রায় কেজি খানেক মাছ হবে। মাছ দেখে প্রামাণিক জিজ্ঞাসা করল,
-কোথা থেকে মারলে ও শরিফের বাপ, খুব সুন্দর মাছ তো।
-ঐ যে বিলের রাই বোনা খেতের নিচে খাঁ-এদের খাপালটা আছে ওখান থেকে। পানি নাই খালি মাছ।
-আবার যাবা না?
-হ, অবশ্যই যাব। আসছি শুধু পাতিল ডিস নিতে।
আব্বাস মিয়া ডিস পাতিল পাতিল গুছিয়ে চারুটা শরিফের হাতে দিয়ে বলল,
-চল তুমিও যাই।
আমি বললাম,
-জমি চাষ দিতে যাব যে?
-জমি পরে চাষ দিবানে, আগে চল যাই মাছ মেরে আনি।
প্রামাণিকের দিকে তাকাতে বলল,
-যাও যাও আগে মাছ মেরে আনো, যে সুন্দর মাছ। জমি কাল চাষ দিলেও হবে।
রহমত আলী মাছ দেখে খুব প্রশংসা করল। বলল,
-আমার স্কুল না থাকলে আমিও যেতাম।
প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা তিনজন বিলের দিকে ছুটলাম।

পর্ব- ১২

Author:luckyrazob

Leave a Reply